‘নদীর পাশে, জলের কাছে, নীলের সাথে’ ঘুড়ি আনন্দ আয়োজন ২০১৭ :: ঘুড়ি পরিবারের সঙ্গে মহানন্দের একদিন!

ঢাকার একঘেয়ে দমবন্ধ নাগরিক জীবন ছেড়ে একদিন এক রঙ্গা এক ঘুড়ি পরিবারের সঙ্গে ‘নদীর পাশে, জলের কাছে, নীলের সাথে’ ঘুরে বেড়ানোর সুযোগটি এবার আর হাতছাড়া করতে চাইনি। ঘুড়ি পরিবারের প্রধান কবি নীল সাধু ও তুলা ভাবী আগেই আমাকে এই আনন্দ ভ্রমণের ব্যাপারে উৎসাহিত করেছিলেন। সে অনুযায়ী এবারের এই আনন্দ ভ্রমণে প্রকৃতির কাছে যাওয়ার দিনক্ষণ আগেই নির্ধারণ হয়েছিল ২১ জুলাই ২০১৭, শুক্রবার।

গত ৯ বছর ধরে স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক মানবিক মানুষের সংগঠন এক রঙ্গা এক ঘুড়ি ঢাকা মহানগরীর সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের নিয়ে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। পাশাপাশি দেশের দুর্যোগ দুর্বিপাকে, বন্যা, শীতের সময়ও দেশের অসহায় দুস্থ মানুষদের পাশে থাকে তারা। নিমতলী অগ্নিকান্ড, সাভার রানা প্লাজার দুর্ঘটনায় তাদের অবদান ছিল প্রথম দিন থেকেই। প্রতি বছর বাংলাদেশের একটি জেলার শীতার্ত মানুষদের উষ্ণতা দিচ্ছে, কম্বল সহ শীত পোষাক বিতরণ করছেন। এমনই নানা মানবিক সামাজিক কাজে তারা অবদান রাখছেন।

ট্রেন, নৌ বাস ভ্রমণে আমাদের ৬৪ জনের একটি দল যাত্রা শুরু করেছিল কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে সকাল সোয়া সাতটার এগারো সিন্ধু’র ট্রেনে। সাধুদা স্বয়ং রেল মন্ত্রী’র সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আমাদের জন্য রেলের পুরো একটা বগি বুকিং করেছিলেন। আমাদের বগিটা ছিল ‘ঠ’। একেবারে রেলগাড়ির সামনে ইঞ্জিনের সাথের বগি। এই আনন্দ ভ্রমণ নিয়ে সাধুদা ফেসবুকে ‘নদীর পাশে | জলের কাছে | নীলের সাথে। ঘুড়ি আনন্দ আয়োজন ২০১৭’ নামে একটি পেইজ খুলেছিলেন। আমরা সবাই এই ভ্রমণের সকল আপডেট সেখানে রাখতাম। সাধুদা টাইম টু টাইম সেই পাতায় সকল আপডেট দিচ্ছিলেন। ট্রেনের টিকিট কনফার্ম করা, সকালের নাস্তা কী হবে, দুপুরের খাবার কী হবে, কোথায় কোথায় যাত্রা বিরতি, কখন কোথায় নৌকাভ্রমণ, কোথায় নদীতে সাঁতার কাটা, কখন কোথায় জুমা’র নামাজের বিরতি, কখন কোথায় ফটো সেশন ইত্যাদি ইত্যাদি। আগেই সাধুদা সবাইকে জানিয়ে দিয়েছিলেন আমরা সবাই কমলাপুর থেকে ট্রেনে উঠব। যারা এয়ারপোর্ট থেকে উঠবে, তারা যেন ফেসবুকে এই ভ্রমণের পাতায় সারাক্ষণ আপডেট দেয়। এমন একটি আনন্দ ভ্রমণকে ক্যামেরায় ধরে রাখার জন্য আমি আমার ‘হরিবোল’ সিনেমার এসিসট্যান্ট ডিরেক্টর ও সহকারী ক্যামেরাম্যান প্রণব দাসকে আগেই জানিয়ে রেখেছিলাম। আমার চিফ এসিসট্যান্ট সেলিম হায়দারের নবাবপুরের অফিস থেকে ক্যামেরা নিয়ে প্রণবের রাতে আমার বাসায় থাকার কথা। রাত দশটায় প্রণব জানালো, দাদা আমি একটু পরে রওনা দেব।

ভোরবেলা তুলা ভাবীর ফোন। শুভ সকাল না বলে দিলেন একটা ঝাড়ি। ফোন ধরেন না ক্যান! হায় মাবুদ। আমার তখনকার দশা তুলা ভাবী যদি একবিন্দুও বুঝতেন! বা আন্দাজ করতে পারতেন! যাক তুলা ভাবীকে বললাম, এখনই আমি রওনা দিচ্ছি।
সকাল সাড়ে ছয়টায় আমি আর প্রণব কমলাপুর রেল স্টেশনে পৌঁছালাম। প্রণবকে বললাম, চল আমরা ট্রেনে গিয়ে বসি। সবাই আসার আগে একটু ঘুমাই। আমি আর প্রণব এই ভ্রমণের প্রথম যাত্রী হিসেবে কমলাপুর পৌঁছেছিলাম বলে আমরা এগারো সিন্ধু ট্রেনের নির্ধারিত ‘ঠ’ বগিতে গিয়ে একটু ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। আবার সাধুদার ফোনে ঘুমে ব্যাঘাত। কইলাম, আমরা ট্রেনে আছি, আপনারা কোথায়, আসেন। তারপর একে একে ঘুড়ি পরিবারের সদস্যরা এসে ট্রেনের বগি টইটম্বুর।

বাংলাদেশ রেলওয়ে’র এগারো সিন্ধু’র সোয়া সাতটার ট্রেন কয়টায় ছাড়বে, এটা নিয়ে কিছুটা বিভ্রম ছিল বটে, কিন্তু শেষপর্যন্ত সকাল পৌনে আটটায় এগারো সিন্ধু যাত্রা শুরু করলো। আমরাও হৈ হুল্লোড়ে মেতে উঠলাম। সাধুদা আর তুলা ভাবী ঘুড়ি পরিবারের অনেকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। প্রণবকে কিছু ইন্সট্রাকশন দিয়ে আমি একটা ঘুম দেবার চেষ্টা করলাম। সারাদিনের জন্য এনার্জি রি-চার্জ করার জন্য ওটা আমার খুব দরকার ছিল। এরমধ্যে ঘুড়ি পরিবারের কেউ একজন এসে আমাকে ঘুম থেকে তুলে সকালের নাস্তা দেবার চেষ্টা করলেন। আমি তাকে না করে দিলাম। কিন্তু আর ঘুমাতে পারলাম না। ততক্ষণে ট্রেন এয়ারপোর্ট স্টেশনে এসে গেছে।

ঘুড়ি পরিবার এগারো সিন্ধু ট্রেনের ‘ঠ’ বগি’র সামনে বিশাল এক ব্যানার টানিয়ে রেখেছিল, যাতে এয়ারপোর্ট থেকে দলের বাকিরা সবাই চট করেই আমাদের নির্ধারিত বগিতে উঠতে পারে। অনেকেই উঠতে পারলো। কিন্তু পাঁচটি মেয়ে আর ওদের দুর্বল দলপতি ছেলেটি ট্রেনে উঠতে পারলো না। হায় হায়! এবার কী হবে! সাধুদাকে বললাম, ওদের ফোন করে বলে দেন, যেন পরের কোনো ট্রেনে উঠে চলে আসে। সাধুদা খোঁজ নিলেন। আর তেমন একটা ব্যবস্থা ওরা করবে বলে ঠিক হলো!

এগারো সিন্ধুতে আমাদের বগিতে ততক্ষণে গানে লিড করেছে নুরুল ইসলাম পারভেজ। পারভেজ খুব ভালো বাঁশি বাজায়। খুব ভালো গান করে। কোনো ঢোল বা মন্দিরা না থাকায় গানের দলে আমার কোনো কারিশমা দেখানোর সুযোগ ছিল না। তাই আমি প্রণবের থেকে ক্যামেরা নিয়ে ওদের পুরো গানের অংশটা শ্যুট করেছিলাম। গান করেছে তাসলিমা, বৃষ্টি, সারা, জাহাঙ্গীর ভাই, তুষার ভাই, জাহিদ সুমন, তানহা, বনি, উপমা, প্রাপ্তি, তুলা ভাবী, ইকু, তানভীর, জাহিদুল সরোয়ার, আফতাব জামান ভাই, ইশতিয়াক, হাফিজ, অয়ন আবদুল্লাহ, চর্যাপদ, লুৎফর রহমান পাশা ভাইসহ অনেকে।

এমন হৈ হুল্লোড়ের মধ্যে কখন যে আমরা ভৈরব পৌঁছে গেছি, সত্যি একদম টের পাইনি। ওদিকে শ্রাবণধারা চলমান থাকায় পুরো স্টেশনে তখন তিল ধারণের ঠাই নাই। অগত্যা আমরা ভিজে ভিজেই প্লাটফরমের উল্টো দিকে আশ্রয় পাবার চেষ্টা করলাম। এবার এয়ারপোর্ট থেকে যারা ট্রেন মিস করেছে, ওদের জন্য বৃষ্টির মধ্যে অপেক্ষা করার পালা। ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল সোয়া দশটা। আমরা স্টেশনে ঘুরে ঘুরে তখন ছবি তুলি, চা খাই। সিগারেট খাই। গাল গপ্পো করি। আর কেউ কারো ছাতা নিয়ে কাড়াকাড়ি। এরমধ্যে সাধুদা জানালেন স্টেশনে এইমাত্র দাঁড়ানো ট্রেনে মিসিং টিমের ছয় জন এসে গেছে।

এবার আমাদের ব্যাটারি চালিত গাড়িতে করে ভৈরব ফেরিঘাটে যাবার পালা। বৃষ্টি না থাকলে হেঁটেই যাওয়া যেত। কিন্তু সাধুদা ঘোষণা করলেন, আমরা ব্যাটারি চালিত গাড়িতে যাব। একটা গাড়িতে সাত জন যাওয়া যায়। শামীম আপা’র নেতৃত্বে একটা গাড়িতে আমরা উঠলাম। পুরো দলের সব গাড়ি আমাদের পেছনে ফেলে চলে গেল। তার মধ্যে আমাদের ড্রাইভার এক ছোকরা। কখন যে গাড়ি পাল্টি খায় সেই চিন্তায় সবার মুখ শুকিয়ে খাক। পথে এক ট্রাক আটকে প্রায় বিশ মিনিট আমরা আটকে থাকলাম। তারপর ফেরিঘাটের কাছাকাছি যেতেই কেউ একজন বলল, আমরা ভুল পথে যাচ্ছি। তো এবার আবার গাড়ি ঘুরিয়ে ঠিক পথে যাবার পালা। আমাদের মত যারা এই ভুল করেছে, সবাই গাড়ি ঘুরিয়ে ভৈরব রেলওয়ে স্কুলের পাশ দিয়ে নদীর ঘাটের দিকে আগালাম।

ভৈরবের এই নদী ঘাটে অনেক পাথর আছে। খুব সুন্দর জায়গা। মনোরম দৃশ্য। মেঘনা নদীতে জোড়া সাঁকো। শামীম আপা এই দফায় অনেক ফটোগ্রাফি করালেন আমাকে দিয়ে। সবাই ফটো তোলায় ব্যস্ত তখন। প্রণবকে নিয়ে ওদের সেই হৈ চৈ ক্যামেরায় ধারণ করালাম। ততক্ষণে সাধুদা প্রায় পাঁচশো জনের ধারণক্ষমতা সম্পন্ন বিশাল এক ট্রলার নিয়ে পাথরঘাটে হাজির। সবাই দলবেঁধে সেই ট্রলারে উঠলাম। এই পর্যায়ে অয়ন জিজ্ঞেস করেছিল, ভাইয়া বৃষ্টিতে তো আমাদের নৌবিহারটা মাটি হতে যাচ্ছে। জবাবে বললাম, আমরা ট্রলারে ওঠার পর আর বৃষ্টি হবে না। আসলেই আর বৃষ্টি হয় নাই। আমরা ফেরার সময় যখন ট্রলারের ছাদে প্রখর রোদে সবাই হায় হুতোস করছে, তখন অয়ন আবার আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ভাই আরেকটা ভবিষ্যৎ বাণী দেন! কইলাম, আর দেওয়া ঠিক হবে না।

শ্রাবণ মাসে মেঘনা নদীর অপরূপ সৌন্দর্য যারা কাছ থেকে না দেখেছে, তাদের সেই বর্ণনা শোনানো এক ব্যর্থ প্রয়াস। বাংলাদেশ নদীর দেশ। কিন্তু আমরা এমন এক জাতি, আমরা নদী দখল করে ব্যবসা করি। নদী দখল করে বসতি গড়ি। নদী দখল করে সম্পত্তি বানাই। ঢাকার চারপাশে চারটা নদী। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালি ও তুরাগ। কিন্তু আমাদের সরকারগুলো এই নদীর কোনো যত্ন তো করেই নাই, উল্টো সেই নদীগুলো দখল, দূষণ আর ভরাট করে এমন অবস্থা করেছে যে, এখন বুড়িগঙ্গার তীরে গেলে নদী পচা গন্ধ শুকতে হয়। বুড়িগঙ্গা মেরে সেখানে ক্যান্টনমেন্ট গড়ে তোলা হয়েছে। একটা জাতির কতোটা অধঃপতন হলে তারা নদী দখল করতে পারে!

মেঘনা নদীতে এসে বুড়িগঙ্গার সেই কষ্ট কিছুটা দূর হলো। নদীতে নৌকায় ভেসে চলা মানে নদীতে চলাচলরত অসংখ্য স্টিমার, নৌকা, গাঙচিল, দু’পাশের জনপদ আমাকে এক নস্টালজিয়ায় নিয়ে যায়। সেই নস্টালজিয়ায় কিছুটা খোরাক যোগালেন সাধুদা ও ঘুড়ি পরিবার। এখানে নদীর পশ্চিম পাড়ে ভৈরব আর পূর্ব পাড়ে আশুগঞ্জ। আমরা মেঘনা নদীতে ভাসতে ভাসতে আশুগঞ্জ ছেড়ে লালপুর বাজারে এসে ত্রিশ মিনিটের একটা যাত্রা বিরতি দিলাম। লালপুর বাজারে আমরা চা খেলাম। ছবি তুললাম।

আবার আমরা ইঞ্জিন চালিত ট্রলারে মেঘনার বুকে ভাসতে লাগলাম। ট্রলারের একেবারের চূড়ার জায়গাটি নিয়ে তখন তুলা ভাবী আর আমার মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হলো। আমি ট্রলার থেকে নামলে তুলা ভাবী সিটটা দখল করেন। আবার তুলা ভাবী ট্রলারের অন্য কোথাও গেলে আমি সেই সিট পাল্টা দখল করি। আমাকে সঙ্গ দেয় বৃষ্টি, সারা, তসলিমারা। এভাবে মেঘনায় ভাসতে ভাসতে আমরা একপর্যায়ে বাইশ মৌজার ঐতিহ্যবাহী বাজারে ত্রিশ মিনিটের যাত্রা বিরতি করি।

বাইশ মৌজা থেকে আমরা মেঘনা নদীকে রেখে তিতাস নদী ধরে আগাতে থাকলাম। আমার ওস্তাদ ঋত্বিক কুমার ঘটক তাঁর ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছবির দৃশ্যায়ন করেছিলেন ঠিক এই জায়গাগুলোতে। আমার নস্টালজিক মনে তখন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছবির দৃশ্যগুলো ফ্ল্যাশব্যাক হচ্ছিলো। তিতাস এখানে মেঘনার তুলনায় অনেক ছোট। আরও সামনে গিয়ে আমরা তিতাসের একটি ছোট্ট শাখা ধরে আগালাম। এই জায়গায় মনে হবে অনেকগুলো নদী। আসলে এগুলো সব মেঘনা ও তিতাসের শাখা বা উপনদী। ঠিক দুপুর একটায় আমরা উত্তর লক্ষ্মীপুর পীর বাড়ির ঘাটে ল্যান্ড করলাম। উত্তর লক্ষ্মীপুরের এই পীর বাড়ি হলো সাধুদা’র নানা বাড়ি। এখানেই সাধুদার জন্ম। প্রতি বছর এখানে বড় পীরের জন্ম ও মৃত্যু দিবসে তিন দিনের উরশ হয়। পীর বাড়ির সামনে বেশ বড় একটা খেলার মাঠ। সেখানে আমরা ফুটবল খেলতে শুরু করলাম।

এদিকে মাইক অন করে সাধুদা বারবার ঘোষণা দেওয়া শুরু করলেন, দেড়টায় জুমা’র নামাজ। এর আগে আপনারা ফুটবল খেলা বন্ধ করে যারা সাঁতার কাটতে চান, তারা সাঁতার কাটবেন। যারা নামাজ পড়তে চান, তারা নামাজ পড়বেন। আর নামাজ শেষে ঠিক দুইটায় আমরা কিন্তু দুপুরের খাবার খাবো। কিন্তু কে শোনে কার কথা। জুমা’র নামাজের কারণে অবশ্য ফুটবল খেলা সোয়া একটায় বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু এরপর শুরু হলো নদীতে সাঁতার কাটা। সাধুদা মাইকে বারবার ঘোষণা দিচ্ছেন, যারা সাঁতার জানেন না, তারা কেউ নদীর ভেতরের দিকে যাবার চেষ্টা করবেন না। তীরের কাছে থাকবেন। প্রণবকে নিয়ে সাঁতারের কিছু ফুটেজ নেবার পর আমিও নেমে পড়লাম ডুবাডুবিতে। একপর্যায়ে পিচ্চিদের নিয়ে ট্রলার থেকে লাফিয়ে নদীতে পড়ার সেই শৈশবের আনন্দ আমাকেও পেয়ে বসলো। ওদিকে সাধুদা সাঁতার শেষে আবার মাইকে বকবক করছেন, আপনারা আর পাঁচ মিনিটের মধ্যে সাঁতার শেষ করেন। কিন্তু আমরা তখন ঘোর শৈশবে মহানন্দে লাফাচ্ছি, সাঁতার কাটছি।

আমি বড় হয়েছি বলেশ্বর নদের তীরে। নদীতে আর পুকুরে সাঁতার কাটা ছিল আমার শৈশবের একটা বিশাল বিনোদন। সাধুদার নানাবাড়িতে এসে সেই বিনোদনের সূত্র আবার পেলাম। একপর্যায়ে সাধুদা মাইকে ঘোষণা দিলেন, যারা দেরিতে আসবে, তারা খাবার পাবে কিনা আমরা জানি না। কারণ, আমাদের সবার খুব ক্ষুধা লেগেছে। আমরা আর দুই মিনিটের মধ্যে খেতে বসব। যারা সাঁতার কাটতে চান, নিজ দায়িত্বে খাবার পেলে খাবেন, না পেলে বইসা থাকবেন। এবার আমাদের হুশ ফিরলো। তাইতো, অনেক ক্ষুধা লেগেছে। এবার আর সাঁতার কাটা চলে না।

সাধুদার দুই মামী আমাদের খাবার ব্যবস্থাপনা তদারকি করলেন। চিংড়ি মাছের ভাজি, মুরগীর মাংস, ডাল আর ঘরে বানানো দই। আহা কী যে সুস্বাদু সেই খাবার। অতিরিক্ত সাঁতার কেটে যে পরিমাণ ক্ষুধা লেগেছিল, তা পুষিয়ে দিলাম ডাল আর দই দিয়ে। দীর্ঘদিন এই দইয়ের স্বাদ আমার মুখে লেগে থাকবে। আহা ঘরে বানানো খাঁটি দই। খাবার সময় শৈশবের যোগেন দইওয়ালার সেই প্রিয় ডাক ‘দই, ভালো দই’ বলে বেশ কয়েকটা চিৎকারও ছুড়লাম।

খাওয়া শেষে সেই মাঠের গাছের ছায়ায় বসলো কবিতা পাঠ, গান ও গল্প বলার আসর। কবিতা পড়লেন সাধুদা, জাহাঙ্গীর ভাই, তুষার ভাই, জাহিদ ভাই, জামান ভাই, চর্যাপদ ভাই, পাশা ভাই, তাসলিমা। আমি ছোট্ট করে গল্প শোনালাম আর সেদিনের ঘুড়ি পরিবারের সঙ্গে আনন্দ অনুভূতি ব্যক্ত করলাম। তাসলিমা গান শোনালো। পারভেজ বাঁশি শোনালো, গান শোনালো। এক পর্যায়ে সাধুদা ঘোষণা করলেন, আমরা ঠিক চারটায় আবার ট্রলারে উঠব। তারপর সেই মাঠে আমাদের গ্রুপ ছবির ফটো সেশন করা হলো। এরপর মামীদের ও সাধুদার নানা বাড়ির অন্যদের থেকে বিদায় নিয়ে আমরা ট্রলারে উঠলাম। এবার আমরা তিতাস ও মেঘনা নদী ধরে আশুগঞ্জ গিয়ে নৌবিহার শেষ করব।

এবার ফেরার পথে রোদের বেশ তাপ। আমরা ট্রলারের ছাদে বসে ছবি তুললাম। গান গাইলাম। আর নদীর দু’পাশের অসংখ্য মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে করতে ঠিক সাড়ে পাঁচটায় আশুগঞ্জ পৌঁছালাম। এর মধ্যে এক ঘটনা ঘটেছে। গ্রুপ ছবি তোলার সময় কে যেন আমার হাতে ক্যামেরা ধরিয়ে দিয়েছিলেন, ক্যামেরার মালিককে পাওয়া যাচ্ছে না। তুলা ভাবীকে মডেল বানিয়ে অনেক ছবি তুললাম সেই ক্যামেরায়। একপর্যায়ে সাধুদাও মডেল হলেন। ট্রলারে বসে বসে নদী ও নদীর দু’পাশের ছবি তুলে আমি ততক্ষণে মেমোরি কার্ড ভরতি করে ফেলেছি। এখন বোকা ক্যামেরার মালিকের খবর নাই। সাধুদাকে বললাম, এই ক্যামেরার যে মালিক, তাকে একটু দরকার। সাধুদা বললেন, টেনশন নিয়েন না। ক্যামেরার যে মালিক, সে ঠিকই আপনার থেকে ক্যামেরা বুঝে নেবে। কেউ না নিলে আমার কাছে দিয়েন।

আশুগঞ্জে ট্রলারে নেমে পুরো টিমকে হটিয়ে দিয়ে সাধুদা, শিমুল আর আমি একটু পেছনে থেকে গেলাম। আমাদের কিছু জরুরি মিটিং করার জন্য। সবার পেছনে হেঁটে হেঁটে আমরা সেই মিটিং শেষ করে সামনে এসে দলের অনেককে আর পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকে হাঁটার ভয়ে রিক্সা নিয়ে বাস স্ট্যান্ড চলে গেছে। কিন্তু সাধুদার প্লান ছিল পাহাড়ি টিলা টপকে সবাইকে হাঁটিয়ে বাস স্ট্যান্ড নেবার। কিন্তু দলের অর্ধেকের বেশি রিক্সায় করে আগেই ভেগে গেছে। শেষপর্যন্ত আমরা কয়েকজন পাহাড়ি টিলার মত উঁচু ঢিবি টপকে সেই রোমাঞ্চ শেয়ার করলাম। ওই পুরোটা পথ আমরা হেঁটেই বাস স্ট্যান্ড এসেছি।

সাধুদা আগেই বলেছিলেন যে, বাসে ওঠার আগে আমরা মালাই চা খাবো। আমরা পুরো এলাকায় একটা চক্কর দিয়ে এক পশলা চা খেলাম। বাসের কোনো খবর নাই। মালাই চা খেয়ে আমরা যখন বাসে উঠব ঠিক তখন ক্যামেরার মালিকের দেখা মিললো। ক্যামেরার মালিক আমাদের লুৎফর রহমান পাশা ভাই। পাশা ভাই এসে বললেন, রেজা ভাই এবার ক্যামেরাটা দেন। আমি তো এখান থেকে বিদায় নিচ্ছি। বুঝলাম, পাশা ভাই’র নৌবিহার শেষে একটু শ্বশুরবাড়ি ঘুরে আসার বাসনা জেগেছে। আশুগঞ্জ বাস স্ট্যান্ডে আমরা দলের ৬৪ জন থেকে একমাত্র পাশা ভাইকে রেখে ৬৩ জন আবার ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। পাশা ভাই আমাদের বিদায় দিয়ে শ্বশুর বাড়িতে দিকে আগালেন।

ঢাকা থেকে দূরের শহরের বাসগুলো অনেক ভালো। সে তুলনায় ঢাকা থেকে কাছের শহরগুলোর বাসগুলো তত ভালো না। কিন্তু আশুগঞ্জে সাধুদা অনেক ভালো একটা বাস ম্যানেজ করেছেন। কিন্তু ড্রাইভারের চান্দি অনেক গরম। আমাদের বাংলা সিনেমার অচল গানগুলো ফুল ভলিউমে বাজিয়ে উল্টাপাল্টা বাস চালানো যেন তার মিশন। বাসের ড্রাইভারকে প্রায় আমাদের সবাই বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও আমাদের নৌপরিবহন মন্ত্রী’র চ্যালা এই ড্রাইভার নিজের পছন্দমত সারা পথ জোরসে বাস চালালেন। তুলা ভাবী এক ধমক দিয়ে তার ফুল ভলিউমের গান বন্ধ করালেন। কিন্তু জোরসে বাস না চালানোর ব্যাপারটা আমরা কেউ তাকে বুঝিয়েও করানো গেলা না।

এরপর শুরু হলো ঘাটে ঘাটে আমাদের দলের কেউ কেউ নেমে যাবার পালা। নরসিংদীতে নামলো কয়েকজন। কাঁচপুর ব্রিজের ওপারে নামলো কয়েকজন। নারায়ণগঞ্জের একটা দল নামলো কাঁচপুর ব্রিজের এপারে। কয়েকজন নামলো যাত্রাবাড়ীতে ফ্লাইওভারে ওঠার আগে। রাত এগারোটায় আমরা কমলাপুর বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছালাম। অবশিষ্ট দলের থেকে বিদায় নিয়ে আমি আর প্রণবও এরপর ছুটলাম নিজেদের গন্তব্যে।

গোটা দিনের নানান কিসিমের আনন্দময় ঘটনাগুলো বারবার তখন ফ্ল্যাশব্যাক দিচ্ছিলো মাথার ভেতরে। এমন একটি আনন্দময় দিন উপহার দেওয়ার জন্য ঘুড়ি পরিবার এবং বিশেষভাবে সাধুদা ও তুলা ভাবীকে অসংখ্য ধন্যবাদ। এখন থেকে আমিও ঘুড়ি পরিবারের একজন। ঘুড়ি পরিবারের অন্যান্য সকল কর্মযজ্ঞে আমিও সানন্দে যোগ দিতে চাই।

ঘুড়ি পরিবারের সবাইকে শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ।
জয়তু ঘুড়ি পরিবার। জয়তু নৌবিহার!

———————————–
রেজা ঘটক
কথাসাহিত্যিক ও চিত্র পরিচালক
২৪ জুলাই ২০১৭

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>