চমকে ওঠার গল্প ।। সালাহ উদ্দিন শুভ্র

‘জীবিতের বা মৃতের সহিত সম্পর্কহীন’
আইরিন সুলতানা
প্রকাশক : এক রঙ্গা এক ঘুড়ি প্রকাশনী।
প্রচ্ছদ নবী হোসেন।
মূল্য: ১৮০

বাংলা ভাষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তার বিখ্যাত এক লেখায় বলেছিলেন, ছোট গল্প মরে যাচ্ছে। তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন কারণ ব্যাখ্যা করে কথাটি বলেছিলেন। তার বক্তব্য ছিলু যে ছোট গল্পের প্রেক্ষাপট নাই হয়ে যাচ্ছে, ফুরিয়ে যাচ্ছে, ফলে আর এই ধারার গল্প লেখা সম্ভব হবে না। তার কথা কতটা ঠিক সেই আলাপে এখন যাব না। তবে বাংলাদেশে অন্তত বাংলা ভাষার ছোট গল্প আরেকদিন থেকে মরে যাচ্ছে। সেটা হলো গল্পে গল্প না থাকা। অনেকটা বিবরণ, খইফোটার মতো শব্দ চয়ন, ভাষার কারসাজি ইত্যাদি বেশ আছে, কিন্তু গল্পটা নেই। কাহিনী নেই। হাল আমলের ‘গল্পকারদের’ গল্পগুলো গল্পহীন।
ছোটগল্পের একটা সাধারণ চরিত্র হলো তার শেষটা। শেষে এসে সে পাঠককে ভড়কে দেবে, চমকে দেবে, শোয়া থেকে দাঁড় করিয়ে দেবে, টনক নাড়িয়ে দেবে। যেমন আন্তন চেখভ (বহুল পঠিত জন্য শুধু তার নামটাই নেওয়া যায়)। স্বাধীন বাংলাদেশে এমন গল্প লেখা হয়েছে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পের এই স্বভাব কমই আছে। কিন্তু আশি বা নব্বইয়ের সময়ের কোনো কোনো গল্পকারের এই প্রতিভা ছিল। মাহমুদুল হক, হুমায়ূন আহমেদ, আল মাহমুদ এমন কয়েকজনের নাম করা যায়। তাদের অনেক পরে কেউ কেউ আছেন ছোটগল্পের মেজাজটা ধরে রেখেছেন। এবারের অর্থাৎ ২০১৭ সালের বই মেলায় প্রকাশিত হওয়া একটি গল্পের বইয়েও তার নজির দেখলাম। বইটির নাম ‘জীবিতের বা মৃতের সহিত সম্পর্কহীন’। লেখক আইরিন সুলতানা। কবিতা দিয়ে সাহিত্য শুরু করলেও গল্পেও তিনি বেশ সাবলীল। গল্প করতে জানেন এই ক্ষমতা তার অন্তত আছে।
কে কে আইরিন সুলতানার সময় গল্প করতে জানেন না তার হদিসে এখন আমি যাব না। আমি আইরিনেই মত্ত থাকব। তার বইয়ে ১৬টি গল্প আছে। রাজনৈতিকভাবে তাদের রাস্তা এক। তবে ভিন্ন ভিন্ন গলিপথ ও আবাসস্থল থেকে তাদের আসা। তাদের চলাচলের রাস্তা আলাদা, কথা বলা আলাদা, জীবনের ঘটে যাওয়া ঘটনা আলাদা, বেদনা ভিন্ন এবং ভাষাও ভিন্ন। আইরিন বেশ রসাল গল্প করতে পারেন। পাঠকের মুখে মুচকি থেকে অট্ট নানারকম হাসি ফুটে উঠবে। চকিত্তে মনে পড়ে যাবে হুমায়ূন আহমেদের কথা। তবে তা ক্ষণিকেই। আইরিন হুমায়ূন নন তো বটেই, তিনি নিজস্ব।
তার সবগল্প নিয়ে স্বল্প পরিসরে বলা সম্ভব না। কিন্তু এসব গল্পে তিনি যে স্বাক্ষর রেখেছেন তা বলা সম্ভব। আইরিন আমাদের সময়ের, একেবারে নাগরিক জীবনের গল্প বলেছেন। সবগুলো গল্পই তার একেবারে সাম্প্রতিক। গতকালের ঘটে যাওয়া ঘটনা, আজকে ঘটবে যে সেই ঘটনা। এটাও আমাদের সময়ের অনেক গল্প লেখকদের মধ্যে পাওয়া যায় না। তারা বেশিরভাগ গ্রামে চলে যান, ঢাকা শহরে যাদের চেনেন না তারা সেই বস্তিতে চলে যান। লেখকদের বেশিরভাগই মধ্যবিত্ত অবস্থানের সন্তান। তাদের সঙ্গে দুই পক্ষের যোগাযোগ মেলামেশা ঘটে বটে এবং তা নিয়েই গল্প হয়। সত্তর, আশি বা হুমায়ূন আহমদদের সময়কার গল্পকাররা এই কাজ করেছেন। মধ্যবিত্ত গল্পের চরিত্রকে তারা উচ্চবিত্তের অথবা নিম্নবিত্তের ঘরে পাঠিয়েছেন। তাদের সঙ্গে মিল, অমিল, দোনামোনা, অস্বস্তি, অনাধুনিকতা সব মিলিয়ে যে অপ্রস্তুত দশায় পড়ে মধ্যবিত্ত চরিত্রটি তা নিয়ে গল্প করেছেন। আইরিনের এমন দুই/একটি গল্প আছে যদিও। কিন্তু তিনি আরো সর্ব সাম্প্রতিক। একেবারে হাতের করের ওপর বসিয়ে নাগরিক মধ্যবিত্ত বা ঢাকাইয়া মধ্যবিত্ত বললে আরো সঠিক হয়, যে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেন তা নিয়ে তিনি গল্প করেছেন।
ঢাকাইয়া মধ্যবিত্তের অন্দরে ঢুকে পড়েন আইরিন। তাদের ফ্যান্টিসিকে তিনি বের করে আনেন। তবে তা কুৎসিত রূপে না, গল্পের রূপেই, হাস্যরসের সঙ্গে। যেমন একটি গল্পের কথা ধরা যাক, ‘গল্পটি কোনো জীবিত বা মৃত টকশোর সহিত সম্পর্কহীন’ এই গল্পটির কথা। এই গল্পের প্রধান চরিত্রর একই দিনে চারটি টক শো আছে। সকাল থেকে তিনি ঐ টক শোয়ের মধ্যে ঢুকে পড়েন। ক্লাস নেয়া, কলিগদের সঙ্গে আলাপ, পচিশটি মেসেজ পাঠান এওব কিছুতেই তার টক শো। তিনি বাস্তবের জগতের সঙ্গে সম্পর্কহীন এক হাওয়াই আমেজ নিয়ে ঘুরে বেড়ান। টিভি এবং তিনি বক্তা হিসাবে যে ইস্যুর বেলুনে হাওয়া ভরেন তা যে নাগরিক বিরক্তি উৎপাদন করতে পারে সে বিষয়ে উভয়েই বেমালুম নির্বোধ থাকেন। অথবা জাতির কাণ্ডারি হিসেবে টক শো বক্তা যে মূল্য দাবি করেন তা কতটা ফাঁপা সে বুঝিয়ে বলতে হবে না। তো এমন ‘হালকা’ বিষয় নিয়েই আইরিন গল্প লেখেন। হালকা বলছি এ কারণে যে আমাদের সময়ে গল্প লেখার মূল ট্রেন্ড হলো গভীর দার্শনিক উপলব্ধির ভার গল্পের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়। গল্প লিখেই যেন উদ্ধার করে ফেলা যাবে কোনো জনজাতিকে তাদের দূর্ভোগ থেকে। আইরিন সেই পথের পথিক নন। তিনি হালকা চালে মজা করেন। সেই গল্পেই আছে এমন বিবরণ- ‘টকশো আরো একটি জমজমাট ইস্যু পেয়েছে। অসংখ্য নতুন মুখে টকশগুলো টগবগে। এরা সবাই চ্যানেলগুলোর রিডান্ডেন্ট প্রজেক্টের অংশ। টকশোর সকল বক্তা চুতমারানি টপিকে ক্যামেরা ফাটানো বক্তব্য দিচ্ছে।টিভি পর্দায় বারবার চুতমারানি উচ্চারণে দর্শক এতটাই উত্তেজনাবোধ করছে যে, হাগুমুতু চাপিয়ে টকশো দেখছে।’
‘বজলুল পাই যে সন্ধ্যায় খুন হলেন’ গল্পটিও আমাদের নির্মম সময়ের ঘটনাকে তুলে ধরে। সময়টা নির্মম এ জন্য যে সমাজে আমরা যাকে বিজ্ঞ বলে উল্লেখ করি, ধারণ করি না তাকে। আমরা মঞ্চে তাকে উঠাই কিন্তু আবার একা ছেড়ে দেই। তিনি একা হয়ে গেলে অনিরাপদ হয়ে পড়েন। এই অবসরে তিনি হয় হামলার স্বীকার হন কিম্বা অ্যাক্সিডেন্ট। এবং মৃত্যু ঘটার পর সমাজে চাঞ্চল্য দেখা যায়। এই গল্পে বজলুল পাই মেধাবি লোক। সমাজে তিনি বেশ সম্মানিত। তাকে কোন বইমেলার উদবোধক হিসাবে রাখা হয়েছে। তার কাজের জন্য ‘উত্তরীয়’ সম্মাননাও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অনুষ্ঠান শেষে তিনি ফিরে যাচ্ছেন একা, আর তখনই তার মৃত্যু ঘটে। সম্ভবত দূর্ঘটনায়। লেখক পরিষ্কার করেন না এখানে কীভাবে তার মৃত্যু হলো। এই বজলুল পাই অবশ্য গল্পের শুরু থেকে একটা মায়ার মধ্য থাকেন। তিনি তার চারপাশের সঙ্গে কল্পনার এক আবডাল তৈরি করেন। মঞ্চে বসে বসেই আইনস্টাইনের সঙ্গে কথা বলেন। কথাগুলো এমন- ‘কী হত যদি আলোকের গতির বদলে মনের গতিকে আইনস্টাইন তার ‘ই ইক্যুয়ালস টু এমসি স্কয়ার’ ইক্যুয়েশনে বসাতেন? প্রশ্নটা আইনস্টাইনকেই করেছিলেন বজলুল। আইনস্টাইন জুলুজুলু চোখে তাকিয়েছিল।’ এগুলো সামান্য রসিকতা নয় যদিও। কারণ মনের বিভ্রমেই তো পেয়ে বসেছে বজলুলকে। তোয়াজকারীদের সান্নিধ্যে তিনি আরাম পাচ্ছেন না। সে জন্য মনে মনে ছুটে গেছেন আলোর চাইতে গতিধর মনের যানে চড়ে আইনস্টাইনের কাছে।
এমন আরো গল্প নিয়ে ধরে ধরে বলতে গেলে আইরিনের সমালোচনা লম্বা হতে থাকবে। ‘খাঁজটা একটা ফাঁদ’, ‘জয়নাল বৈরাগীর ডিএনএ কেস’, ‘গণক জামালের ভাগ্য পাথর’ এগুলো বেশ ছোট গল্প। কিন্তু চমকে দেওয়ার মতো। বিশেষ করে জয়নাল বৈরাগীর ডিএনএ কেস। এক বেশ্যার খদ্দেরের ধর্ম নির্ধারণের জন্য তারা ডিএনএ টেস্ট করার দার্শনিক দাবি উত্থাপনের গল্পটি অসাম্প্রদায়িকতাকে যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করে। তবে এটি দার্শনিক একটি প্রশ্নকেও খুঁচিয়ে তোলে। মানুষের ধর্ম পরিচয়ের সঙ্গে ডিএনএ এর যোগসূত্র থাকার বিষয়ে বিজ্ঞানের বক্তব্য কী? এই ধাঁধার কী কোন উত্তর আছে? আপাত সরল মনে হলেও জটিল ও দীর্ঘসূত্রীতাকে আইরিন তুলে ধরতে পারেন বেশ ভালভাবেই।
ভাষায় এবং গল্পে যে সাম্প্রতিক থাকেন এই লেখক তার একটি নজির দেই। চাকা গল্পে আছে, ‘এত দীর্ঘ কথার লুপের কারণ হলো, আমার মানিব্যাগ নামক সিস্টেমে অর্থ নামক প্রোগ্রামটিকে কম্পাইল করতে গেলে ফ্যাটাল এররের সম্মুখীন হতে হয় অহরহ’। ‘ডিজিটাল’ সময়ে এমন রসকষায়িত ভাষা কমই দেখেছি। কিন্তু এমন রসের শেষটা কেমন করুণ। এখানেই চমকে দেন লেখক। যারা পড়বেন গল্পটি তারাই বুঝবেন। এখন এখানে এই গল্পটি নিয়ে বলছি না।
আইরিনের বেশ কয়েকটি গল্প আছে প্রেম নিয়ে। নাগরিক রোমান্টিসিজম তাকে ভর করে আছে বোঝা যায়। এসব গল্প নিয়ে ভালো নাটকের স্ক্রিপটও হতে পারে। একেবারে শুরুর গল্প ‘মেলে না’ অথবা ‘অগ্নিশর্মা’ খুব মিষ্টি প্রেমের গল্প। তবে ‘অন্তরের হাউস’ আধুনিক সমাজেও নির্মম সামন্তী দাপটের কাহিনী। অন্তরকে জীবন দিয়ে তার প্রেমের স্বীকৃতি আদায় করতে হয়েছে। এই জীবন দেয়া সিনেম্যাটিক নয়। নিজ পরিবারের সঙ্গে অন্তরের মনস্তাত্ত্বিক বুঝাপড়া আর দ্বন্দ্বের ফলাফল এই মৃত্যু। এই গল্পও পাঠকের মনে দাগ কাটবে।
আরেকটি বিষয় হলো রাজনীতি। এক্ষেত্রেও অকপট আইরিন। নিজের রাজনীতির পথটিও তার সামনে ফরসা এবং তাতে চলাচলেও কোনো আত্মবিশ্বাসহীনতা তার নেই। ‘নীল খামে চিঠি’ প্রেমের হলেও মুক্তিযুদ্ধে আমাদের হারানোর বেদনা সেখানে প্রকট। ‘ইজ্জত আলীর কবর’ বর্তমানের তরুণদের ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতার গল্প। শ্রেণি সংকটের গল্প ‘এক বয়াম জুতা’। একজন বাস কন্ডাকটরের হেল্যুসিনেশনের গল্প। তাল সামলাতে না পারার গল্প।
সব গল্প সুখপাঠ্য আইরিনের। সরল গদ্যে তিনি গল্প লেখেন। তার রয়েছে গভীর দার্শনিক ও রাজনৈতিক অভিসন্ধি। যার তার গল্প পড়বেন তাদের স্বীকার করতে হবে গল্প লেখার ক্ষমতা তার আছে। ছোট গল্পের তার কাছ থেকে আরো অনেক কিছু পাওয়ার আছে বাংলা সাহিত্যের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>